,
সংবাদ শিরোনাম :

নীলচোখ (৮ম পর্ব)

সময় সংলাপ ডেস্ক

নীলচোখ (৮ম পর্ব)
লেখা: Tashriq Intehab

রাশেদ কে মাদ্রাজ নিয়ে যাবার সমস্ত কাজ শেষ হয়েছে। আজ রাতেই রাশেদকে নিয়ে যাওয়া হবে। মাহিমা আর মেহেদি অভিভাবক হিসেবে তার সাথে যাবে। নীলাশা আর শিখা থাকবে দেশেই। শিখার খানিকটা ভয় লাগছিলো পুরো বেপারটা ঘিরে, তাই সে তাদের বাড়ি চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো।

তারা বের হবে এমন সময় বয়স ৭০ এর কাছাকাছি এক ভদ্রলোক এসে মাহিমার সাথে দেখা করার জোর করলেন। মাহিমার সাথে মেহেদিও দেখা করতে আসলো ভদ্রলোকের কাছে। লোকটি বেশ উচুকাধের লোক, লম্বা ছয়ফুট এর বেশী হবে। সম্পুর্ন সাদা দাড়ি, আর চুল। মুখেও রয়েছে এক মায়াভরা ভাব। মাহিমা কাছে আসতেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন,
০- আমার নাম স্টিফ, বাবা বাংলাদেশী মা ইউরোপিয়ান হবার কারনে আমি দু দেশেরই নাগরিক বটে। আমি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
মাহিমা ভদ্রলোককে ভালো করে দেখে কিছু ভাবলো তারপর বলতে লাগলো,
— জ্বি বলুন।
০- আপনি রাশেদের অভিভাবক হিসেবে মাদ্রাজ যাচ্ছেন এ কথা আমি জানতে পেরেছি। পৃথিবীতে কারন ছাড়া কিছু ঘটেনা। রাশেদের কোমাতে যাওয়া, আপনার সাথে তার দেখা হওয়া, শিখা, সায়মা, নীলাশা যত কিছুই ঘটেছে সব কিছুর পিছনে রয়েছে এক রহস্য।
— আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন। মেহেদি প্রশ্ন করলো।
০- আমি রাশেদ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি, তার সাথে আমার অনেকটা সময় পেড়িয়েছে। ৭ বছর আগেই রাশেদ বাংলাদেশে আসে, শিখার খোজে, সেই থেকে রাশেদের কোন খোজ নেই। আমি গত দুবছর ধরে রাশেদের সন্ধান করে যাচ্ছি, কিন্তু তাকে যতক্ষনে খুজে পেলাম, অনেক দেরী হয়ে গেলো। ইতিমধ্যে রাশেদের চর্চা সমস্ত মিডিয়া তোলপাড় করে তুলেছে। দেশের সরকার পর্যন্ত তাকে নিয়ে পড়েছে। সি.আই.ডি, পুলিশ, ডিবি সবাই রাশেদের জীবিত হবার সন্ধানে লেগে আছে, যার কারনে আমি জনসম্মুখে এসে আমার পরিচয় দিতে পারছিনা। কিন্তু আপনাদের সাথে আমার মাদ্রাজে দেখা হবে, তখন আমি আপনাদের সব কিছু বলবো। বলবো এক রোমহর্ষক ঘটনা। যা রাশেদ আর সায়মার সাথে ঘটেছিলো, এদের দুজনের ঘটনায় অকারনে নাঈমুল স্যারের প্রান যায়নি। তাকেও হত্যা করা হয়েছিলো, সে জেনে গিয়েছিলো এক গোপন কথা যা তার জানা উচিত ছিলোনা। আর একটি কথা রাশেদ ১৩ বছর আগে মারা যায়নি, তাকে কবর দেওয়া হয়েছিলো এটা সত্য, কিন্তু সেদিন রাতেই তাকে সেখান থেকে বের করা হয়েছিলো। আর এই কর্মকান্ড দেখে ফেলেছিলো নাঈমুল এই কারনেই তার প্রাণ যায়। আশা করি আপনারা আমার এই কথাগুলো গোপন রাখবেন এতে আপনাদেরই মঙ্গল। এখন হাতে সময় নেই বেশী আমাকে মাদ্রাজের জন্য বের হতে হবে, বাকি কথা আমরা সেখানেই আলোচনা করবো।

মাহিমা আর মেহেদি অবাক চোখে এই বৃদ্ধলোকটির কথা শুনে গেলো, অনেক গোপন কথাই সে জানিয়েছে যা এখনো সবার আড়ালে। যেমন সায়মা আর নাঈমুল এর কথা মিডিয়া এখনো জানেনা। সে যদি মিডিয়ার নিউজ নিয়ে কথা বলতে আসতো, তবে সে এত গভীর কথাগুলো বলতে পারতো না। মাহিমা স্টিফ কে প্রশ্ন করলো,
০- আপনার সাথে রাশেদের কিসের সম্পর্ক?
— সেটা পড়ে জানা যাবে, আপাদত আপনি এগুলো রাখুন কাজে আসবে পরবর্তীতে । খবরদার এগুলো যেন কারো নজরে না আসে বা কেউ জানতে পারে এমন কাজ করবেন না। তাহলে অনেক বিপদে পড়বেন আপনারা।

স্টিফ মাহিমার হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগ ধরিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলো। মাহিমা আর মেহেদি এক নজরে তাকিয়েছিলো সেই পলিথিনের দিকে, ধৈর্য্যহাড়া হয়ে যাচ্ছিলো ব্যাগের মধ্যে কি আছে জানার জন্য। কিন্তু স্টিফ এর সতর্কবাণী যেন অন্যকেউ এটার সম্পর্কে না জানে। তাই তারা এটা গোপনে দেখবে বলে ঠিক করলো, মাহিমা তাড়াতাড়ি পলিথিন এর ব্যাগটি তার ব্যাগে গুজে এম্বুলেন্স এ উঠে বসলো।



প্রায় দুদিনের বাইরুট জার্নি করে তারা মাদ্রাজ পৌছালো। রাশেদকে বিজিএস হাসপাতাল এ ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের পাশেই একটি আবাসিক হোটেলে তারা থাকার ব্যবস্থা করলো। সমস্ত কাজকর্ম শেষ করতে প্রায় রাত হয়ে আসলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে মেহেদি আর সায়মা হোটেল এ ফিরে গেলো। দুজনেই ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারের জন্য নিচে আসলো। একটি ফাকা টেবিল দেখে তারা দুজন বসে মেনুকার্ড দেখছিলো। তখনি স্টিফ এসে তাদের সামনের চেয়ারে বসলো। দুজনেই থমকে গেলো কিন্তু খুব বেশী অবাক হবার কিছু নেই, স্টিফ আগেই বলেছিলো সে মাদ্রাজে আসবে। মেহেদি খুব বেশী না ভেবে সাধারণ ভাবেই বললো,
০- আপনার জন্য কি অর্ডার করবো মিঃ স্টিফ?
— ফ্রাইড রাইস, চিকেন এন্ড ড্রিঙ্কিনওয়াটার। স্টিফ জানালো।

সবাই নিজ নিজ পছন্দের খাবার অর্ডার করলো। ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে গেলো। মাহিমা চোখ পাকিয়ে স্টিফকে বলতে লাগলো,
০- আপনার বাংলাভাষা এত ভালো কিভাবে? আপনি তো জন্ম থেকেই ইউরোপ ছিলেন।
— আমি তো বলেছিলাম আমার বাবা বাংলাদেশী। আমার বাবা মায়ের ডিভোর্স হবার পর বাবা বাংলাদেশে চলে আসেন। তাই আমি প্রতি ছয় মাস মায়ের সাথে বাকি ছয় মাস বাবার সাথে থাকতাম। এতে করে দু দেশেরই ভাষা আমার খুব ভালো করে জানা।
০- আপনি কোন দেশের নাগরিক?
— গ্রীস দেশের। সেখানেই আমি পড়ালেখা করেছি।
মাহিমা আর প্রশ্ন করলো না। মেহেদি কিছুক্ষন চুপ থেকে বলতে লাগলো,
০- কিছু মনে করবেন না, আপনি কোন ধর্মের?
স্টিফ মুচকি হেসে নিয়ে কি যেন ভাবলো, তারপর বলতে লাগলো
০- বাবা মুসলমান, মা খ্রিষ্টান। তাই আমি দুই ধর্মেরই মানুষ। কথাটি বলে একটু উচু শব্দেই হেসে উঠলো স্টিফ।

এরইমধ্যে ওয়েটার খাবার নিয়ে চলে আসলো। টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে চলে গেলো তারা। মেহেদি মাহিমার প্রচন্ড খিদা পেটে, এই চামচ টামচ দিয়ে বিদেশী স্টাইলে খেলে তৃপ্তি আসবেনা, বাংলাদেশীরা হাত দিয়ে খেতেই পছন্দ করে। সুস্বাদু খাবার হলে আংগুল চেটে খাবার যে স্বাদ আর তৃপ্তি রয়েছে পৃথিবীর অন্য কোন স্ট্যাইলে খেলে এমন মনে হবেনা। তাই মেহেদি প্লেট থেকে ছুড়ি, চামচ নিচে নামিয়ে রাখলেন, আরেকবার হাত ধুয়ে এসে হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। স্টিফ অবাক হলোনা কারন সেও অর্ধ বাংগালী কম বেশী বাংলা সভ্যতা সম্পর্কে তার জ্ঞান রয়েছে। স্টিফ ও হাত ধুয়ে এসে চামচ ছাড়াই খেতে লাগলেন, কিছু মানুষ তাদের কে এমন ভাবে দেখছে যেন এলিয়েন পৃথিবীতে নেমে এসেছে। আসলে ফরেনার রা কখনো হাত দিয়ে তো খায়না তাই অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক। ইন্ডিয়ানরা আবার অবাক হয়না এসব ব্যাপারে, তারাও হাতে খাবার মজা বুঝে।

মাহিমা খেতে খেতেই স্টিফ কে প্রশ্ন করলো,
০- আপনি কি যেন জানাতে চেয়েছিলেন?
— এমন জায়গায় এসব আলোচনা করা ঠিক না। খাবারের পর রিসোর্ট এর দক্ষিন পাসে সে সুইমিংপুল রয়েছে সেখানে আসবেন, ওখানে বসেই আলোচনা করবো।

কেউ আর কোন কথা বাড়ালোনা। চুপ চাপ খেয়ে যে যার রুমে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিতে চলে গেলো। রাত ১০ টার সময় মেহেদি আর মাহিমা সুইমিংপুল এর কাছে গিয়ে একটি টেবিলে বসে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে স্টিফকে খুজতে লাগলো। স্টিফ ১০.৩০ এর নাগাত সেখানে উপস্থিত হয়ে,
০- আপনারা তো খুব তাড়াতাড়ি এসে পড়েছেন আমি তো ভাবছিলাম আমিই তাড়াতাড়ি যাচ্ছি। যাইহোক মাদ্রাজ কেমন লাগছে আপনাদের কাছে? স্টিফ ঠোটে হাসি নিয়ে কথাগুলো বললো।
— সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছিনা, মাথায় এত বড় টেনশন নিয়ে কি আর ভালো থাকা যায়। মেহেদি বললো।
০- তা অবশ্য মিথ্যে নয়। তো মাহিমা আপনিও কি একই রোগে আক্রান্ত।
— অনেকটা তাই মিঃ স্টিফ। যাইহোক আপনি কি নীলচোখ সম্পর্কে কিছু জানেন?
০- হ্যা জানি। তবে নীলচোখ পর্যন্ত আলোচনা যাবার আগে আপনাদের আরো অনেক কিছু জানতে হবে। রাশেদ আর অশরীরী এক নারীর প্রেমের কথা।

অশরীরী নারী! মেহেদি অবাকাতুর ভাবে প্রশ্ন করে বসলো।
০- হ্যা অশরীরী নারী, বা আধ্যাত্মিক নারী। যার ছায়া নেই যাকে দেখা যায়না এমন এক নারীর প্রেমে পড়েছিলো রাশেদ। একমাত্র রাশেদই তাকে দেখতে পারতো, এবং এই সমস্ত খেলা সেই নারীর নির্দেশেই হয়েছিলো।

মেহেদি আর মাহিমার চিন্তাভাবনা কোথায় যেন গুলিয়ে গেলো, অনেকটা পথ পেড়িয়ে আবার এক ধাক্কা।
০- আপনি কি একটু খোলাখুলি ভাবে বলবেন এত টেনশন আর নিতে পারছিনা।

স্টিফ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলতে লাগলো, আজ থেকে পনেরো বছর আগে। রাশেদ একজন তান্ত্রিক ছিলেন। কালোবিদ্যায় পারদর্শী এক ব্যক্তি রাশেদ। তার কাছে প্রতিটি ধর্ম ছিলো সম্মানজনক। সে সব ধর্মকেই মান্য করতেন, বাবা মা মুসলমান ছিলেন তাই সে সবার কাছে মুসলমান হিসেবেই পরিচিত। সে বিভিন্ন জায়গা থেকে তান্ত্রিক বিদ্যায় বিদ্যায়ন হয়েছিলো। একবার সে ঠিক করলো তার একটি প্রেমিকা প্রয়োজন, এবং সে এমন এক নারীকে প্রেমিকা বানাবেন, যাকে কেউ দেখতে পাবেনা, যাকে কেউ চিনবে না, তাই সে চিন্তা করলো এক পবিত্র নারীর আত্মার সাথে তার প্রেম নিবেদন চালাবেন।

টানা ৪১ দিন সে তপস্যা করলো তার প্রেমিকা খোজার জন্য। অবশেষে এক আমাবস্যার রাতে সে এক অশরীরীর দেখা পেলো, এবং সে ছিলো নীলচোখের রক্ষীবাহিনীর একজন। সে অশরীরী এতই রুপবতী ছিলো যে তাকে দেখা মাত্রই রাশেদ তার প্রেমে পড়ে গেলো। তার দেওয়ানা হয়ে গেলো। মুহুর্তেই রাশেদের কাছে মনে হচ্ছিলো এই অশরীরীকে পেতে জীবন চলে গেলেও তাকে কোন আফসোস থাকবেনা। তার ভাবনা যত সহজ ছিলো কিন্তু রাশেদের ভাগ্য তার থেকে কয়েক হাজারগুন জটিল করে লেখা ছিলো।

নীলচোখের রক্ষীকে মন্ত্রবিদ্যার জোরে নিয়ে আসায় সেই অশরীরী রাশেদের উপর ক্ষিপ্ত হলো, এবং তাকে শর্ত দেওয়া হলো, যদি সে নীলচোখকে মুক্তি দিতে পারে, তবেই এই অশরীরী নারী তার প্রেম কবুল করবে। আর যদি না পারে তবে রাশেদ কে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে, এবং এই শাস্তি থেকে রক্ষা পাবেনা তার কোন আপনজন।

(চলবে………)


প্রতিদিন সব ধরনের খবর জানতে ও মজার মজার ভিডিও দেখতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক কমেন্ট শেয়ার করে এক্টিভ থাকুন -বাংলাদেশ অনলাইন, পত্রিকা, সময় সংলাপ ডট কম,আমাদের ফেইসবুক পেজ লাইক দিতে নিচে ফেইসবুক লাইক বটন এ ক্লিক করুন ,অনেক ধন্যবাদ আবার আসবেন

sponser