,
সংবাদ শিরোনাম :

বছরে ৯০০০ কোটি টাকার স্বর্ণের ব্যবসা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই

সময় সংলাপ ডেস্ক

দেশে বছরে প্রায় নয় হাজার কোটি টাকার স্বর্ণের বাজার রয়েছে। বিক্রি হওয়া স্বর্ণের সিংহভাগই আসে চোরাচালানি বা অবৈধ উপায়ে। দেশের স্বর্ণের ব্যবসার ওপর সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন এমন তথ্য উপস্থাপন করেছে। গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে স্বর্ণ খাতের ওপর সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের মান ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসায়ীরা। খাতটি জবাবদিহিতাহীন, হিসাববহির্ভূত ও কালোবাজারনির্ভর। এই অবস্থায় স্বর্ণ খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। এ ছাড়া দেশে স্বর্ণের চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন, যার সিংহভাগ পূরণ হয় চোরাচালানে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষক দলের অপর দুই সদস্য টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার অমিত সরকার এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে স্বর্ণখাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে গবেষণায় ১৫টি ক্ষেত্রে ৯০টি সুপারিশ পেশ করেছে টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে দৈনিক ২৫ কোটি টাকার স্বর্ণ লেনদেন হয়। যা বছরের হিসাবে ৯,১২৫ কোটি টাকা। চাহিদার সিংহভাগ স্বর্ণ আসে চোরাচালানের মাধ্যমে। চোরাচালানের বিরুদ্ধে সমপ্রতি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চোরাকারবারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুবই কম। তিনি বলেন, স্বর্ণ খাতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে স্বর্ণের চাহিদা ও জোগান নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বছরে স্বর্ণের চাহিদা সর্বনিম্ন ২০ টন থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টন। এ চাহিদার ১০ শতাংশ পুরোনো স্বর্ণ (তেজাবি) থেকে পূরণ হয়। টিআইবির আশঙ্কা, প্রতি বছর নতুন স্বর্ণের চাহিদার প্রায় ১৮-৩৬ টনের সিংহভাগই পূরণ হয় চোরাচালানির মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, স্বর্ণের মান এবং দাম নির্ধারণেও সরকারের ভূমিকা না থাকায় প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা। ডিসেম্বরের মধ্যে স্বর্ণ নীতিমালা করার সরকারি ঘোষণার বাস্তবায়ন দাবি করে টিআইবি।
এই গবেষণার ভিত্তিতে একটি খসড়া নীতিমালা তারা সরকারকে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, এই খাত সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি করা হবে।
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থলবন্দর ও বিমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের একাংশের যোগসাজশ ও সম্পৃক্ততার স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। দেশে একটি সুষ্ঠু স্বর্ণ আমদানি নীতি না হওয়া এবং চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার পেছনে চোরাচালান চক্র, স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের প্রভাব রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই খাতে সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বর্ণের বাজার ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। চোরাচালান-নির্ভর ব্যবসা। এ খাতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ স্থলবন্দর, বিমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ, ব্যবসায়ী চোরাকারবারিদের যোগসাজশে এই অনিয়ম অব্যাহত আছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে বিভিন্ন ক্যারেটের যে গয়না বিক্রি করা হয় বাস্তবে তাতে কী পরিমাণ বিশুদ্ধ স্বর্ণ থাকে তা পরিবীক্ষণ ও তদারকির জন্য সরকার অনুমোদিত ব্যবস্থা নেই। ফলে অতিরিক্ত খাদ মিশিয়ে ও অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করে ক্রেতাদের প্রতারিত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি সুষ্ঠু স্বর্ণ আমদানি-নীতির অনুপস্থিতিতে এবং সার্বিকভাবে দেশের স্বর্ণখাতের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাবে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের মান এবং স্বর্ণবাজার ব্যবসায়ীদের দ্বারা একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অবৈধভাবে দেশের বাইরে থেকে আসা স্বর্ণালংকার বাংলাদেশের স্বর্ণবাজার ক্রমশ দখল করে ফেলেছে। স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের মান যাচাই, ক্রেতা ও বিক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণ ও স্বর্ণ শিল্পী বা শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। সম্ভাবনাময় খাত হওয়া সত্ত্বেও উৎসাহমূলক পদক্ষেপ গৃহীত না হওয়ায় বাংলাদেশে রপ্তানি শিল্প হিসেবে স্বর্ণখাতের বিকাশ হয়নি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বর্ণ চোরাচালান ও কালোবাজারি সংশ্লিষ্ট কিছু আইনি বিধান রয়েছে। তবে এ নিয়ে কোনো সমন্বিত আইন নেই। যেটা আছে তারও প্রয়োগের বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। যার ফলে এই খাতটি বিকাশমান ও সম্ভাবনাময় হলেও টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে না। সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মলনে বলা হয়, গত চার বছরে আটককৃত স্বর্ণের পরিমাণ ১ হাজার ৬৭৫ কেজি, যা বছর প্রতি ৪১৮.৭৩ কেজি। বৈধ পথে আমদানি না হওয়ায় বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ৪৮৭-৯৭৪ কোটি টাকা।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গবেষণায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। তবে কী পরিমাণ ব্যক্তি জড়িত সেই তথ্য আমাদের হাতে নেই।
তিনি বলেন, দেশের স্বর্ণখাতে জবাবদিহিতার অভাব, হিসাববহির্ভূত ও বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালার অভাব এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। গবেষণায় এটা পরিষ্কার বাংলাদেশে চোরাচালানটা অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে।
গবেষণায় বাংলাদেশের স্বর্ণখাতের বেশকিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো- দেশের স্বর্ণবাজারে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধান, পরিবীক্ষণ তথা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকা; জেলা প্রশাসন থেকে ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রয়োজনীয় লাইসেন্স গ্রহণ ও নিয়মিত নবায়ন না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি; খুচরা বাজারে স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কারের ক্রয়-বিক্রয়ে সর্বক্ষেত্রে ইসিআর বা মূসক চালানের ব্যবহার না হওয়ায় ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকি এবং স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কার ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বৃহৎ লেনদেন ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা ইলেক্ট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় অর্থপাচারসহ অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি। এ খাতের জন্য টিআইবি’র পক্ষ থেকে সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বর্ণখাত সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন ও ব্যাগেজ রুলের মাধ্যমে আনা স্বর্ণালংকারের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ও শাস্তি নিশ্চিত করা; বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করে স্বর্ণ আমদানির শুল্কহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়।


প্রতিদিন সব ধরনের খবর জানতে ও মজার মজার ভিডিও দেখতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক কমেন্ট শেয়ার করে এক্টিভ থাকুন -বাংলাদেশ অনলাইন, পত্রিকা, সময় সংলাপ ডট কম,আমাদের ফেইসবুক পেজ লাইক দিতে নিচে ফেইসবুক লাইক বটন এ ক্লিক করুন ,অনেক ধন্যবাদ আবার আসবেন

sponser