,
সংবাদ শিরোনাম :

একটি কফিনের পাশে ঢাকা

সময় সংলাপ ডেস্ক

লাখো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক। শেষ শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানে নানা শ্রেণি-পেশা আর মতের মানুষের সম্মিলনে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয়েছিল অভূতপূর্ব এক পরিবেশ। একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরীর স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষের মন জয় করা নগরপিতার অকাল মৃত্যুতে চোখের পানি ফেলেছেন অগণিত মানুষ। শোকাতুর মানুষের চাওয়া ছিল একটাই, সবুজ ঢাকার স্বপ্নদ্রষ্টা আনিসুল হকের নেয়া উদ্যোগগুলো যেন আলোর মুখ দেখে। তার নেয়া সুন্দর পরিকল্পনাগুলো যেন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। মানুষের জন্য কাজ করে, স্বপ্ন দেখে, মানুষের প্রিয় হয়ে ওঠা আনিসুল হকের শেষ যাত্রাটাও যেন হয়ে উঠেছিল সফলতার আরেকটি অধ্যায়।

কোনো জনপ্রতিনিধির মৃত্যুতে এমন সর্বজনীন শোক আর শ্রদ্ধার দৃশ্য নিকট অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। নানা পথ আর মতের মানুষ একসঙ্গে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কাজপাগল আনিসুল হকের প্রতি। শনিবার সকালে লন্ডন থেকে আনিসুল হকের লাশ দেশে আসলে নেয়া হয় তার বনানীর বাসায়। সেখানে পরিবারের সদস্য, স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীরা একনজর দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমান। আনিসুল হকের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে সেখানে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারাও যান সেখানে। বিকালে আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বসাধারণের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয় আনিসুল হকের প্রতি। সেখানে লাখো মানুষ অংশ নেন তার শেষ জানাজায়। পরে বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে ছেলের কবরে চির নিদ্রায় শায়িত হন আনিসুল হক।
বাড়িতে শোকাতুর পরিবেশ: শনিবার সকাল থেকেই বনানীর ২৩ নম্বর সড়কের ৮০ নম্বর বাড়ি ঘিরে শোকাতুর পরিবেশ। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ডিএনসিসি কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মেয়রের আত্মীয়স্বজন, গণমাধ্যমকর্মীসহ উৎসুক জনতা ভিড় করেন সেখানে। বিমানবন্দরে বড় ভাইয়ের লাশ গ্রহণ করেন ছোট ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ প্রটোকলসহ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে মেয়রের মরদেহ বাসায় এসে পৌঁছায়। তখন সর্বস্তরের মানুষের ঢল সামলাতে হিমশিম খায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বাসার ভেতরে-বাইরে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষের চোখ ছিল অশ্রুসজল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাটসহ আরো অনেকে আনিসুল হকের বাসায় যান। মেয়র আনিসুল হককে দেখার জন্য দেশের অনেক বিশিষ্টজন তার বাসায় আসেন। প্রয়াত মেয়রকে নিয়ে তারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, একজন মানুষ যে কত জনপ্রিয় হলে মানুষের ভালোবাসা উপচে পড়ে সেই দৃশ্যই আজ আমি দেখলাম। বহু মানুষকে কান্নার নদীতে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন। তার অভাব কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। এমন বহুগুণীয় প্রতিভার মানুষ আমি আর কোনোদিন দেখি নাই। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা একই এলাকার বাসিন্দা। গত বছর তাকে দেয়া এক সংবর্ধনায় লাখো জনতা উপস্থিত হয়েছিলো। ব্যানার-ফেস্টুনে পুরো এলাকা রঙিন হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন আনিসুল হক একজনই হয়। তার অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়ন করা এখন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আমরা চাইবো তার স্বপ্নের গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি গড়ার। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আনিসুল হক কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হতেন না। উত্তরের অনেক দখলবাজদের কাছ থেকে তিনি অনেক জমি ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করেছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সর্বত্রই সফল। টেলিভিশন উপস্থাপনা করে দেশবাসীর মন কেড়েছিলেন অনেক আগেই। তারপর বিজিএমইএ ও এফবিসিসিআইয়ে একজন দক্ষ এবং সফল সভাপতি ছিলেন। বিপদে আপদে বন্ধুবান্ধবদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতেন। মন্ত্রী বলেন, তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। তিনি আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। একদিন আমাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখালেন তিনি কোথায় কি উন্নয়ন করেছেন। আমি যখন জেলে ছিলাম তখন তিনি আমার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার শূন্যতা কখনই পূরণ হওয়ার নয়। যতদিন ঢাকা মহানগরী থাকবে ততদিন আনিসুল হক বিরাজ করবেন। ব্যবসায়ী একে আজাদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আনিসুল হক যখন ব্যবসায়ী সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন তখন তিনি আমাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতেন এবং বলতেন ৬৪টি জেলায় এফবিসিসিআইয়ের নিজস্ব ভবন হবে। সেই কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরও তিনি এই ঢাকার অনেক উন্নয়ন করেছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন আরো অনেক উন্নয়ন করার। আমরা যেন তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। আমরা দুজনে মিলে এই শহরের হাজারো সমস্যা সমাধানের সূত্রপাত করেছিলাম। জনগণ আমাদের প্রতি আস্থাশীল ছিল। আমরা হয়তো নগরবাসীর সকল সমস্যার সমাধান করতে পারতাম। কিন্তু তিনি মাঝ পথেই চলে গেলেন। আমি এখন অনেকটা একা হয়ে গেলাম। আনিসুল হকের শূন্যতা কখনই পূরণ হবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নিরপেক্ষভাবে সাহসিকতার সহিত একটি স্থানীয় প্রশাসন ভালোভাবে চালানোর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। যোগ্যতা ও সাহসিকতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অনন্য। তার অভাব থেকেই যাবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলাম বলেন, আনিসুল হকের মৃত্যুতে উত্তর সিটি করপোরেশনের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। তিনি শুধু যদি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন তবে আমরা সকল কাজ খুব সুন্দর করে করতে পারতাম। তিনি বলেন, আমরা অনেক কঠিন কাজ সহজেই সমাধান করেছি। মেয়র নগরীর সমস্যা চিহ্নিত করে সবেমাত্র কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তিনি চলে গেলেন।

জানাজায় লাখো মানুষের ঢল: বিকাল তিনটার কিছু আগে আনিসুল হকের মরদেহ আনা হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। এর আগেই স্টেডিয়াম প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় লাখো মানুষে। তাকে এক নজর দেখতে, জানাজায় অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই দলে দলে লোকজন আসতে থাকেন সেখানে। সুসজ্জিত একটি স্টেজে জাতীয় পতাকা ও সিটি করপোরেশনের পতাকা মোড়ানো কফিন রাখা হয়। কফিনের পাশে ছিলেন আনিসুল হকের স্বজনরা। কফিন নেয়ার পর সেখানে সিটি করপোরেশন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মেয়রকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্টেডিয়াম মাঠে আসরের নামাজ শেষে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। এতে লাখো মানুষ অংশ নেন। মাঠে প্রবেশ করতে না পেরে অনেকে মাঠের বাইরে অবস্থান নিয়ে জানাজায় অংশ নেন। জানাজার আগে ও পরে আনিসুল হককে দেখতে শুভানুধ্যায়ীরা ভিড় করলে অনেকটা জটলা তৈরি হয়। শৃঙ্খলার স্বার্থে এসময় স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় আনিসুল হকের মুখ দেখানো হয়। জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে বড় ছেলে নাভিদুল হক উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে বলেন, আমার বাবা সুখী মানুষ ছিলেন। তিনি তার বা পরিবারের স্বার্থে কখনও কাউকে কষ্ট দেননি। কারও খারাপ চাইতেন না কখনও। তারপরও কাজের খাতিরে আপনাদের কারও মনে তিনি কষ্ট দিয়ে থাকলে দয়া করে তাকে মাফ করে দেবেন। জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানে মায়ের কবরের পাশে ছেলের কবরে দাফন করা হয় আনিসুল হককে। দাফনের সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আনিসুল হকের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
কুলখানি ৬ই ডিসেম্বর: প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের কুলখানি আগামী ৬ই ডিসেম্বর বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে এই কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। আর্মি স্টেডিয়ামে মেয়র আনিসুল হকের জানাজা নামাজের আগে এ কথা জানান তার ছেলে নাভিদুল হক। এতে আনিসুল হকের সকল শুভানুধ্যায়ীকে অংশ নেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।


প্রতিদিন সব ধরনের খবর জানতে ও মজার মজার ভিডিও দেখতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক কমেন্ট শেয়ার করে এক্টিভ থাকুন -বাংলাদেশ অনলাইন, পত্রিকা, সময় সংলাপ ডট কম,আমাদের ফেইসবুক পেজ লাইক দিতে নিচে ফেইসবুক লাইক বটন এ ক্লিক করুন ,অনেক ধন্যবাদ আবার আসবেন

sponser