,
সংবাদ শিরোনাম :

ঋণ অনিয়মে বাচ্চু সরাসরি জড়িত

সময় সংলাপ ডেস্ক

বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি কার্যালয়। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক এ সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকটি যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদন দিয়েছে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোনো রকম বাছ-বিচার ছাড়াই স্বেচ্ছাচারীভাবে যাকে খুশি তাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এক সময়ের সবচেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে। যার বিরূপ প্রভাবে বেসিক ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটে। বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণে অনিয়মের ওপর সম্প্রতি সিএজির তৈরি করা বিশেষ অডিট প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনে লোক নিয়োগেও দুর্নীতির ব্যাপক প্রমাণ মিলেছে। প্রথমবারের মতো তৈরি করা সিএজির এই প্রতিবেদনে মোট ৫ হাজার ৩৯৯ কোটি  টাকার গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে। এতে অবৈধ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। ঋণ বিতরণ, নবায়ন, আদায়, পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এই জালিয়াতির পেছনে পরিচালনা পর্ষদের সম্পৃক্ততাসহ ২০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভুয়া গ্রাহক ও জামানতবিহীণ ঋণ প্রদান, পরিচালনা পর্ষদের পছন্দের গ্রাহককে নির্বিচারে ঋণ দেওয়া, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের সুপারিশ আমলে না নেওয়া, অন্য ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দেওয়া, সীমা উপেক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দেওয়া ইত্যাদি।

বেসিক ব্যাংকের ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ওপর সিএজি কার্যালয় এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন  তৈরি করেছে। সিএজির অধীন বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও সংশ্নিষ্ট শাখাগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের মার্চ থেকে একই বছরের আগস্ট পর্যন্ত অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল নিরীক্ষা কার্যক্রম চালায়। গত মাসের শেষে এ প্রতিবেদনটি সিএজি কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। অনিয়মগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ব্যাংকটির সমস্যাকবলিত অবস্থা থেকে উত্তরণে একগুচ্ছ সুপারিশ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয় প্রতিবেদনে।

যোগাযোগ করা হলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে বেসিক ব্যাংক সম্পর্কে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর বেরিয়েছে। সিএজির প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। সিএজির উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং সংস্থাটি ঋণ বিতরণে যে সব অনিয়ম চিহ্নিত করেছে তা সঠিক বলে তিনি মনে করেন। সরকার এ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। সিএজির প্রতিবেদনে ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ পর্ষদকে দায়ী করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে আবদুল হাই বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। ইতিমধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ৫৬টি মামলা করেছে দুদক। এসব মামলায় সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ ১২০ জনকে আসামি করা হয়। কিন্তু মূল হোতা বাচ্চুকে এ পর্যন্ত কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। দুদক সূত্র জানায়, অভিযুক্ত বাচ্চুকে আসামি করার প্রক্রিয়া চলছে।

ব্যাংকটির সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর মূল্যায়ন করে সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ঋণ বিতরণ, আয়-ব্যয়, আমানত সংগ্রহসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবস্থা শোচনীয়। প্রযুক্তি ব্যবস্থা ভালো হলেও পরিচালনায় ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে। কখনও কখনও গ্রাহকরা অবৈধভাবে টাকা তুলে নিয়েছেন, যা প্রযুক্তি বিভাগের ঠেকানোর সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হয়নি। ক্রেডিট কমিটি থাকলেও তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়। ঋণ বিতরণ, আদায়সহ ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংক যে সমঝোতা স্মারক সই করেছে তার শর্ত মানা হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের সকল ক্ষেত্রেই চরম অবনতি হয়েছে। ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণে দুর্নীতি হওয়ায় লাভের পরিবর্তে ২০১৩ সালে ৮৪২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের তৎকালীন এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম এই ব্যাপক লোকসান লুকিয়ে রেখে মাত্র ৫৩ কোটি টাকা লোকসান দেখিয়েছেন।

যে সব অনিয়ম উঠে এসেছে : পাঁচ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ১১১টি গুরুতর অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে সিএজির নিরীক্ষা দল। এতে বেসিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ ১৮টি শাখায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতির ঘটনা চিহ্নিত করা হয়। শাখাগুলো হলো- রাজধানী ঢাকার গুলশান, শান্তিনগর, দিলকুশা, কারওয়ান বাজার, চট্টগ্রামের আগরাবাদ, জুবিলী রোড, ঢাকার বংশাল, ধানমণ্ডি, বাবুবাজার, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, সৈয়দপুর, বগুড়া, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা ও রাজশাহী। এসব শাখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে রাজধানী ঢাকার গুলশান, শান্তিনগর ও দিলকুশায়। এই তিন শাখাতেই প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।

অডিট দল ব্যাংকের বোর্ড সভার প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদনের প্রমাণ পেয়েছে। অডিট দল বলেছে, গুলশান শাখার গ্রাহক না হওয়া সত্ত্বেও এএফজি শিপিং লাইন, মেসার্স শিফান শিপিং লাইন, মেসার্স আমির শিপিং লাইন, এশিয়ান শিপিং লাইনকে জাহাজ কেনার জন্য মোট ২১২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত রাখা হয়নি। গুলশান শাখা থেকে ঋণ না দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তৎকালীন পর্ষদ তা অনুমোদন করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অডিট দল বলেছে, শাখা কর্তৃপক্ষের মতামত উপেক্ষা করে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করেছে। একই শাখায় সুহী শিপিং লাইন নামে এক প্রতিষ্ঠানকে জামানত ছাড়া ১৪৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে অডিট দল।

ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আবদুল হাই বাচ্চু যে প্রভাবিত করেছেন তা উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত ৩২৭ তম বোর্ড সভায় ১০৬টি প্রস্তাব বাচ্চুর একক সিদ্ধান্তে পাস হয় মাত্র ২০ মিনিটে। এসব প্রস্তাব আলোচনার জন্য তখনকার পর্ষদের অন্যান্য সদস্যকে অবহিত করা হয়নি। ওই ১০৬টি প্রস্তাবে ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেন বাচ্চু নিজেই। অডিট দল পর্যবেক্ষণে বলেছে, ১০৬টি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র চারটি ঋণ নবায়নযোগ্য। বাকি ৮৯টি প্রস্তাব নবায়নযোগ্য নয়। বেশির ভাগ ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে এসব ঋণ দেওয়া হয়।

সিএজির প্রতিবেদনে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঋণ বিতরণে যে সব অনিয়ম তুলে ধরা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পর্যাপ্ত জামানত না থাকার পরও মেসার্স মৌসুমী ট্রেডার্সকে ১৬৯ কোটি টাকা ঋণ প্রদান। এ ছাড়া একই গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে আলাদা ব্যবস্থাপনা দেখিয়ে পর্যাপ্ত জামানত না রেখে ১৫১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়।

সুপারিশ : তিনশ’ বিশ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে দুদর্শাগ্রস্ত ব্যাংকটির অবস্থা ভালো করতে ২১ দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভালো গ্রাহককে ঋণ দেওয়া, জামানত বিশ্নেষণ করে ঋণ মঞ্জুর করা, অন্য ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহককে ঋণ না দেওয়া, গ্রাহকের ব্যবসার চাহিদা কী তা বিবেচনা করে ঋণ দেওয়া, ঋণ নবায়ন ও সুদ মওকুফ থেকে বিরত থাকা, ব্যয় কমানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় জনবল ছাঁটাই করা ইত্যাদি।


প্রতিদিন সব ধরনের খবর জানতে ও মজার মজার ভিডিও দেখতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক কমেন্ট শেয়ার করে এক্টিভ থাকুন -বাংলাদেশ অনলাইন, পত্রিকা, সময় সংলাপ ডট কম,আমাদের ফেইসবুক পেজ লাইক দিতে নিচে ফেইসবুক লাইক বটন এ ক্লিক করুন ,অনেক ধন্যবাদ আবার আসবেন

sponser